প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। গতকাল ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদরাসায়। ছবি : পিএমও
একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও গত দেড় দশক ধরে দেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখে আসছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা হলেও কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এ সংগঠনটি আলোচনায় আসে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে কর্মসূচির মাধ্যমে।
এছাড়া জাতীয় নারী নীতি ও মোদিবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে মাঝে মাঝেই সংবাদ শিরোনাম হয়েছে সংগঠনটি। একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশিরভাগ নেতাই বিভিন্ন ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। আবার ভোটের রাজনীতিতে এসব দলের মধ্যে একপক্ষ বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং আরেকপক্ষ প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই অরাজনৈতিক পরিচয়ের হেফাজতে ইসলাম কোনও না কোনোভাবে রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে নয়। আবার একটি বড় ধর্মীয় সংগঠন হওয়ায় তাদের কখনও ভালো আচরণ দিয়ে আবার কখনও জোর করে কাছে পাওয়ার চেষ্টা করে আসছে ক্ষমতাসীন দলগুলো। মতবিরোধ থাকলেও হেফাজত নেতারা সব সময় বলে আসছেন—তারা যেহেতু অরাজনৈতিক, তাই রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে চূড়ান্ত বিরোধে যেতে চায় না তারা। হয়তো এ কারণেই অনেক সময় সরকারের সঙ্গে সংঘাত হলেও আবার আলোচনার টেবিলেও বসেছে।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনা ও ২০১৭ সালে মোদিবিরোধী আন্দোলনে সরকারের বিরুদ্ধে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের হত্যার অভিযোগ আনলেও ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর ‘শুকরিয়া সমাবেশে’ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কওমি জননী উপাধি দিয়েছেন হেফাজতের তৎকালীন আমির প্রয়াত শাহ আহমদ শফি। আবার ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের কয়েক দিন আগেও শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে বৈঠক করেন হেফাজত নেতারা। জুলাই আন্দোলনেও তারা সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকারও সংগঠনটির সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ও সখ্য গড়তে চায় বলে বিএনপি ও সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় রবিবার (৯ আগস্ট) রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে গিয়ে ফটিকছড়িতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এতে সভাপতিত্ব করেন হেফাজত আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। এছাড়া হাটহাজারীর আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের প্রয়াত আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করেন তারেক রহমান। প্রধান বিরোধীদল যখন সরকারবিরোধী আলোচনায় মুখর, ঠিক তখন হেফাজতের সঙ্গে বৈঠক করতে দেশের সরকারপ্রধান ছুটে গেলেন ফটিকছড়িতে। বিষয়টিকে বিএনপি বা সরকারের পক্ষ থেকে সৌজন্যতা বলা হলেও এর পেছনে রাজনৈতিক মাহাত্ম্য খুঁজছেন রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, অতীতে আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জামায়াতকে ঠেকাতে হেফাজতকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করেছে। এবারও প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের সাম্প্রতিক হুমকি-ধমকিতে তারেক রহমান হেফাজতকে নিজেদের আয়ত্তে রাখতে চান কিনা, সে প্রশ্নও সামনে আসছে। অনেকে মনে করেন, জামায়াতের আকিদাগত বিভিন্ন বিষয়গুলো হেফাজতের মধ্যে প্রচার করে সরকার জামায়াতকে দুর্বল করার পরিকল্পনা নিয়ে থাকতে পারে।
আবার হেফাজতই যে সব সময় তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সে ধরনের কোনও নিশ্চয়তাও নেই। কারণ অতীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলেও শেখ হাসিনার সরকারকে হঠাতেও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে হেফাজত। তাই এক্ষেত্রে সরকারকে ধীরগতিতে সামনে এগোতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বজলুর রশিদ ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হেফাজত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও তারা সব সময় রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অতীতে শেখ হাসিনা জামায়াতের বিপক্ষে হেফাজতকে ব্যবহার করতে গিয়ে অনেক সময় তাদের সঙ্গে আপস করেছেন। কওমি জননী উপাধি নিয়েছেন। কিন্তু আখেরে তারাই আবার জুলাই আন্দোলনে তার বিপক্ষে রাজপথে নেছেন। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে রাজপথে আন্দোলন করেছে তারা। তাই তারেক রহমান তাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ভবিষ্যতে কতটুকু সুবিধা করতে পারবেন, সেটিও বিশ্লেষণ সাপেক্ষ।